• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
“ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী” চলন্ত ট্রাকে আড়াই ঘন্টা ঝুলে ৩২ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ করলেন সিপাহি জয়পুরহাট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ ড্রাম ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কা, নিহত ৩ সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার

পার্বতীপুরে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার নামে অপচিকিৎসা: প্রতারিত হচ্ছে মানুষ

সিসি নিউজ।। একটি কোটার ঘরের (মাটির ঘর) ভেতরে স্বপ্নে পাওয়া আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অর্জনকারী এক হুজুর প্লাষ্টিকের চেয়ারে আসীন। সামনে কাঠের একটি টেবিলে তাঁর চিকিৎসা প্রদানের নানা জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আর ঘরের বাইরের দরজার সামনে বেঞ্চিতে বসে রয়েছেন চিকিৎসাসেবা দিতে আসা নানা বয়সী মানুষজন (নারী-পুরুষ)। তাদের সামনে সারিবদ্ধভাবে রাখা পানি ভর্তি বোতল। আর পানি ভর্তি বোতলেই মূলতঃ রোগীদের সিরিয়াল। হুজুর ভেতরে বসে রোগীদের সমস্যার কথা শুনছেন, আর রঙিন কাগজে অবিরতভাবে আরবিতে কিছু একটা লিখে চলেছেন।

সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার এ দৃশ্য চোখে পড়ে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার পাশের দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বেলাইচন্ডী কুটিরপাড়ায় গিয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উল্লিখিত এলাকার মৃত. আকবার আলীর ছেলে রবিউল ইসলাম। ছয় ভাইয়ের মধ্যে সকলের ছোট তিনি (রবিউল)। ছোট বেলায় সৈয়দপুরে শহরের একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলেন। তবে হাফেজ হয়ে উঠা হয়নি। পরবর্তীতে তিনি স্বপ্নে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা পেয়ে হুজুর বনে গিয়েছেন, হয়েছেন সর্ব রোগের মহাচিকিৎসক। আর এ চিকিৎসা পেশাকে জায়েজ করতে বগুড়ার একটি হেলথ ইন্সটিটিউট থেকে এক বছর মেয়াদী আয়ুর্বেদিক একটি সনদপত্র সংগ্রহ করছেন তিনি।

এক সময়ে রবিউল ইসলামের বড় ভাই আধ্যাত্মিক ক্ষমতা মানুষকে সব রোগের চিকিৎসা দিতেন। তিনি আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন রবিউল। আর তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে বাড়ির সামনে বেশ কয়েকটি কবর আবিস্কার করেছেন তিনি। এ সব কবর পীর হুজুর বুজুর্গদের বলে প্রচার চালানো হয়। ওই সব পীর বুজুর্গরাই স্বপ্নে তাকে মানুষের চিকিৎসা সেবা দেয়ার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দিয়েছেন বলে প্রচার করা হয়। আর সে সব কবরের ও হুজুরের বাড়ির সামনে লাল কাপড়ের বেশ কিছু ঝাঁন্ডা শোভা পাচ্ছে। চিকিৎসা নিতে রোগীদের বসার জন্য টিনের চালা ঘরের চারিদিকেও লাল কাপড়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। মূলতঃ মানুষের মধ্যে আস্থা তথা বিশ্বাস সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এসবের ব্যবস্থা করা হয়।

গত শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় হুজুরের বাড়ির সামনে বেশ কয়েকটি রিকশা, রিকশাভ্যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ সব যানবাহনে বহু দূর-দূরান্ত থেকে হুজুরের কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছেন রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনেরা।

সেখানে কথা হয় চিকিৎসা নিতে আসা নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার নিতাই পানিয়াল পুকুর থেকে আসা বৃদ্ধ আইনুল হকের (৫৬) সঙ্গে। তিনি বলেন, পায়ে ব্যথা। দাঁড়ানো শক্তি নেই। হাঁটতে পারি না। লোকমুখে হুজুরের চিকিৎসাসেবার কথা শুনে এখানে এসেছি। এর আগেও দুইবার এসে পানি পড়া নিয়ে গিয়েছি। কিন্তু কোন আরোগ্য পাচ্ছি না। তাই হুজুরকে বলে আবারও পানি পড়া নিতে এসেছি আজ।

সৈয়দপুরের বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের চড়কপাড়ার শরিফুল ইসলাম। তিনি জানান, তার বাড়িতে জ্বিনের আছর পড়েছে। এক সময় মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসায় মেয়ে ভালো হয়েছে। কিন্তু এখন বাড়িতে রান্না করা ভাতে প্রতিনিয়ত মিলছে আস্ত ব্লেড। তাই স্ত্রী সায়মাকে নিয়ে হুজুরের কাছে বুঝাপড়া করতে এসেছি তিনি।

শহরের গোলাহাট এলাকার ময়মেনা খাতুন। শরীকদের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝামেলা চলছে। এর আগেও হুজুরের কাছে এসেছিলাম, তিনি সমস্যার কথা বলে দিয়েছেন। হুজুর বলেছেন পানিপড়ায় ঝামেলা দূর হবে। এ রকম সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া, পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালিসিস), নিঃসন্তানসহ সব ধরণের রোগের চিকিৎসা দেন হুজুর রবিউল ইসলাম। আর চিকিৎসা হিসেবে দেন তেলপড়া, পানি পড়া, তাবিজ ও কিছু আয়ুর্বেদিক ওষুধ। তাঁর কাছে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন সৈয়দপুর, পার্বতীপুর, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ ছাড়াও অনেক দূরদূরান্তের মানুষজন।

নিয়ম অনুযায়ী রোগীরা নিজ নিজ বাড়ি থেকে প্লাষ্টিকের খালি বোতল নিয়ে আসেন। এরপর খালি বোতলে সংগ্রহ করতে হয় হুজুরের বাড়ির সামনে স্থাপিত টিউবওয়েল থেকে পানি। পরবর্তীতে রোগীদের বসা ঘরে পানির বোতলে সিরিয়াল দিয়ে হুজুরের সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়। আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর পর্যায়ক্রমে রোগীদের মিলে হুজুরের সাক্ষাৎ। এরপর সকলের সামনে হুজুরকে নিজেদের শারীরিক কিংবা পারিবারিক সব সমস্যার কথা খুলে বলতে হয়। হুজুর রঙিন কাগজে কিছু লিখেন। পরবর্তীতে পানি বোতলে ফু দিয়ে রোগীর হাতে ধরিয়ে দেন। এরপর রোগী হুজুরের হাতে নগদ টাকা-পয়সা গুজে দিয়ে বিদায় নেন। এভাবে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার শত শত মানুস বিশ্বাস করে হুজুর রবিউল ইসলামের কাছে আসছে চিকিৎসা নিতে। তিনি হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা পয়সা।

চিকিৎসা নিতে আসা শহরের গোলাহাট ময়মেনা জানান, পানিপড়া দিয়ে হুজুর কোন টাকা পয়সা দাবি করেন না। রোগীরা হুজুরকে খুশি করতে নিজেদের ইচ্ছেমতো টাকা পয়সা দেন। কেউ দুইশত, কেউ পাঁচশত টাকা পর্যন্ত দেন হুজুরকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী জানান, হুজুর রবিউল সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে। পানিপড়া ও তেলপড়া দিয়ে হাদিয়া নিয়ে টাকা পয়সা কামাচ্ছেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু জমিজমা ও অর্থকড়ি করেছেন।

হুজুর রবিউল ইসলাম বলেন, আমি নিজে এ পেশায় আসেনি। পীর অলি আউলিয়ারা স্বপ্নে আমাকে এ পেশায় আসতে বাধ্য করেছেন। মানবসেবাই পরম ধর্ম। আমি রোগীদের কাছে কোন মোটা অংকের টাকা-পয়সা দাবি করি না। মানুষজন খুশি হয়ে যা দেন আমি নিয়ে নিয়ে রাখি।

নীলফামারীর সৈয়দপুরের স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. শেখ নজরুল ইসলাম বলেন, এমন অভিনব চিকিৎসা পদ্ধতিতে সাধারণ মানুষ প্রতারনার শিকার হচ্ছে নিশ্চিত। অবশ্যই এ প্রতারনার সাথে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত রয়েছে। যেখানে আধুনিক চিকিৎসায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন আনছে, সেখানে এ ধরনের চিকিৎসা অমূলক ও বিভ্রান্তকর।

পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসনাত খান বলেন, এ ধরনের ঘটনা তিনি জানেন না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

আর্কাইভ